হাতে জ্ঞানযন্ত্র পথচলা বাকি কতটা

ইমেইল প্রিন্ট পিডিএফ

জ্ঞানের পথে চলা নিয়ে মানুষের দুশ্চিন্তা নতুন নয়। কারণ বাঁচতে হলে যে চাই জ্ঞান-তা মানুষ বুঝে গেছে ইতিহাসপূর্ব কালেই। অথবা এভাবেও বলা যায়-পুরনো প্রস্তুরযুগের শেষভাগেই মানুষ উপলব্ধি করেছে-'জ্ঞান চাই'। কারণ বাঁচতে হবে। কল্পনা করতে হবে সেই সময়টার কথা যখন মানুষ বাস করত জীবজগতের অন্যান্য প্রাণিকুলের মতোই খোলা আকাশের নিচে, অনাবৃত দেহে, উপায়-অবলম্বনহীন অবস্থায়। তার আশপাশে ছিল ঢের শক্তিশালী জীবজন্তু, যারা বিপন্ন করে তুলেছিল মানুষের জীবনযাত্রা। ওইভাবে যদি চলতে থাকত তাহলে এতদিনে এই পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা না বেড়ে কমত এবং এতদিনে তারা থাকত বিপন্ন প্রায় প্রাণিকুলের মধ্যে এক নম্বরে। আজকের যে উল্টো অবস্থা তার কারণ মানুষের জ্ঞান। যে জ্ঞান আবার বুদ্ধিকে কাজে লাগানোর উপায় বদলে দেয়। যেমন সভ্যতার ঊষালগ্নে সে দেখেছিল পাহাড় থেকে ছিটকে পড়া ছোট পাথরখণ্ড বৃহদাকার বাইসন-গরু বা সিংহকে মেরে ফেলতে পারে। ধারালো ফলার ধারণা বা জ্ঞানও মানুষ অর্জন করেছে প্রকৃতির একই ধরনের লীলাখেলা থেকে।
জ্ঞানকে আয়ুধে (অস্ত্রে) রূপান্তরই ছিল মানুষের প্রাথমিক বুদ্ধিবৃত্তির প্রয়োগ। এবং মনে রাখা দরকার, যত সুসভ্যতার কথাই আমরা বলি না কেন ওই প্রক্রিয়াটা এখনও চলমান। জ্ঞানই ভোঁতা অস্ত্রে শান দেয়ার বুদ্ধি যুগিয়েছে মানুষকে, শিখিয়েছে আগুন জ্বালাতে, চাকা ঘোরাতে, পশুকে পোষ মানাতে, তাকে দিয়ে লাঙল টানাতে, নানারকম বুনো বীজ সংগ্রহ করে এনে চাষ করতে, প্যাপিরাসের পাতায় জ্ঞানের কথা লিখতে, বড় বড় সংখ্যাকে ছোট চিহ্ন দিয়ে প্রকাশ করতে। তালিকাটি আরও লম্বা করে বলা যায় খনিজ আহরণের কথা, তড়িৎ ধরার কথা, সেচযন্ত্র উদ্ভাবনের কথা, তাঁত চালানোর কথাও।
আসলে হিসাবের জ্ঞানের সূক্ষ্ণতা এবং নির্ভুল প্রয়োগ প্রক্রিয়ার জন্য আমাদেরকে ধন্যবাদ দিতে হয় আদিযুগের তাঁতিদেরকেই। কারণ প্রথম যুগের তাঁত আসলে কোনো যন্ত্র নয়। হিসাবের সূক্ষ্ণতা আর আঁশ বা তন্তুগুলোকে সুবিন্যস্ত করার মরিয়া প্রক্রিয়া থেকেই মানুষ পেয়েছিল বিচিত্রময় আবরণ। 'মরিয়া' শব্দটা এজন্য বললাম-কারণ উন্নত বস্ত্র ছাড়া মানুষের চলতই না, শীত আর তাপ দুটো থেকেই রক্ষা পাওয়ার জন্য প্রথমে আঁশ পরে সুতা বোনার জ্ঞান অর্জন করতে পেরেছিল এবং কী আশ্চর্য! প্রথম যুগের কম্পিউটারেও প্রক্রিয়াজাত করা হয়েছিল।
আমাদের এই যুগের জ্ঞানযন্ত্র কম্পিউটার তাই মোটেই হুট করে চলে আসা কোনো যন্ত্র নয়। মানবসভ্যতার ধারাবাহিক বিবর্তনের বিশেষ বিরাজমান সময়ে মানব মস্তিষ্কের জ্ঞানের সহযোগী হিসেবে মানুষই তৈরি করেছে কম্পিউটার, যা এখন একাধারে জ্ঞান ও যোগাযোগের মাধ্যম হয়ে উঠেছে। না হয়ে যে উপায় নেই এও একরকম 'মরিয়া' প্রক্রিয়াই। কারণ প্রকৃতিতে মানুষের প্রতিকূলতা তো কম নয়। এই যে ক'দিন আগে সুপার কম্পিউটারের অগ্রগণ্য দেশ জাপানে আর্থ সিমুলেটরের মতো সুপার কম্পিউটার থাকার পরও প্রলয়ঙ্করী সুনামি হল, তার আগমনবার্তা পাওয়া গিয়েছিল মাত্র অল্প কিছুক্ষণ আগে। কাজেই জ্ঞানকে উচ্চতর পর্যায়ে তোলার আর প্রয়োজন নেই বলে যারা মনে করেন তারা ভুলই শুধু করেন না-বোকার স্বর্গে বাস করেন। উদাহরণ আরও দেয়া যায়, এই যে নানা প্রাণঘাতী জীবাণু ও রোগব্যাধি মানুষের আয়ু আর জীবনযাত্রা নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে তার বিরুদ্ধে কতটা জোরালো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পেরেছে মানুষ? এইডস-ক্যান্সারের কথা বাদই দিলাম, ডায়াবেটিসের মতো প্রাণঘাতী রোগের কোনো নিদান এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তার মানে এসব রোগ সম্পর্কে জ্ঞান সুপ্রচুর নয়।
দৈব দুর্বিপাক, মহামারী, খাদ্য স্বল্পতা, রাজনৈতিক সঙ্কট এমনকি রাস্তায় যানজটের কারণেও মানুষ হতবুদ্ধি হয়ে পড়ে জ্ঞানের অভাবেই। কাজেই একথা বেশ স্পষ্ট এবং জোর দিয়েই বলা যায়, জ্ঞান-প্রক্রিয়ার বাইরে থাকার চেষ্টা করা মনুষ্য-স্বভাবের বিরোধী। মানুষ এবং সভ্য মানুষ হয়ে বাঁচতে হলে জ্ঞান লাগবে এবং লাগবে আরও অনেক জ্ঞান।
এ পর্যন্ত যে জ্ঞান পাওয়া গেছে বা অর্জিত হয়েছে তা মানবসভ্যতার যে উদ্দিষ্ট তার জন্য যথেষ্ট নয়। এ কথাটা পড়ে কেউ হাসতে পারেন, প্রশ্নও তুলতে পারেন যে, উদ্দিষ্টতা আসলে কী? প্রথম উদ্দিষ্ট-প্রকৃতির প্রতিকূলতা দূর করা, দ্বিতীয় উদ্দিষ্ট-খাদ্যাভাব থেকে বাঁচা, তৃতীয় উদ্দিষ্ট-রোগব্যাধি থেকে মুক্তি আর চতুর্থ উদ্দিষ্ট-সুশাসন।
এগুলোকে পুরো মানবজাতির সমস্যা বলে আমরা সহজেই এড়িয়ে যেতে পারি এবং সেটাই আমরা করছি। কাজগুলো অন্যরা করে দেবে আর আমরা রেডিমেড কাপড়ের মতো তা ব্যবহার করব এই আশাতেই রয়ে গেছেন অনেকে। কিন্তু আমাদের নিজ পরিবেশকে রক্ষা করবে কে? আমাদের খাদ্যাভাব মোকাবেলায় কে এগিয়ে আসবে জাহাজভর্তি খাদ্যশস্য নিয়ে? আর শুধু শস্যজাতীয় খাদ্য দিয়ে তো সব সমস্যা মেটে না-একটু পুষ্টি আর মেদেরও তো প্রয়োজন আছে। আর রোগব্যাধি? দেশের স্বাস্থ্যসেবার চিত্রটা এখানে আর নতুন করে তোলার প্রয়োজন দেখি না। এখন দেশের ভেতরে টাকা খরচ করেও চিকিৎসা সেবা পাওয়া যাচ্ছে না। টেলিমেডিসিন সেবা প্রচলন হতে হতেও কোথায় যেন হোঁচট খেয়ে থেমে গেছে। বেশ বোঝা যাচ্ছে অনেক পিসি, অনেক মোবাইল সেট বিক্রি হলেও এর মাধ্যমে কার্যকর সেটগুলো সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো যাচ্ছে প্রযুক্তির ভীতি আর ভাষার সমস্যার কারণে। সর্বোপরি যারা এই সেবা দেবেন তাদের সদিচ্ছা এবং ত্যাগী মনোভাব প্রয়োজন; প্রয়োজন তাদেরও কিছু কারিগরি জ্ঞান, যা দিয়ে বুদ্ধি খাটিয়ে নিজেদের মতো করে সমস্যা মোকাবেলা করতে পারেন।
আর সুশাসনের বিষয়টার সঙ্গে আইসিটির যোগসূত্রের কথা যদি বলতে চাই, তাহলে সেও এক সাতকাহন হবে। এটুকু এখানে বলে রাখি, আইসিটির জ্ঞানের ভাণ্ডারে গণতন্ত্র-সুশাসন প্রক্রিয়ার বিষয়ে এত বেশি পরিমাণ কনটেন্ট আছে, যাকে অসীমের কাছাকাছি বলাও বোধহয় অত্যুক্তি হবে না। কিন্তু আমাদের দণ্ড-মুণ্ডের কর্তাব্যক্তিরা আইসিটি ব্যবহারের মাধ্যমে সেগুলো পড়েন বা আত্মস্থ করেন বলে তো মনে হয় না। এক উইকিপিডিয়াতে যত তথ্য আছে তা দিয়েই বাংলাদেশের রাজনীতিবিদরা স্বশিক্ষিত হয়ে উঠতে পারেন, কিন্তু সে কাজ তারা করবেন বলে তো মনে হয় না। এখানেও সমস্যা ইংরেজি ভাষা এবং প্রযুক্তিকে ভয় পাওয়া। তবে এ কথাটাও বলে রাখি-যতদিন রাজনীতিবিদরা আইসিটির মাধ্যমে শিক্ষা না নেবেন, ততদিন আমাদের চলমান সমস্যাগুলোর সমাধান হবে না-চলতে থাকবে জীবনের অপচয়।
একটু লক্ষ করুন, বুঝবেন-আপাতদৃষ্টিতে গাড়ি-বাড়ি, শপিং মল, সংবিধান-সংসদ, হাসপাতাল-ওষুধপত্র নিয়ে জীবনকে যত স্বস্তিকর মনে হচ্ছে; আদতে অবস্থাটা তেমন নয়। না, ভয় দেখানোর কথা নয়, রূঢ় বাস্তবতা হলো-বন্যপ্রাণী আর শীত-আতপ থেকে বাঁচার কিছু কৌশল আয়ত্ত করা গেছে মাত্র হাজার দশেক বছরের পথচলায়-এখনও অনেকটা পথ বাকি। অর্থাৎ আরও জ্ঞান অর্জন করতে হবে, আরও বুদ্ধি খাটাতে হবে।
এই যে আজকাল জ্ঞানভিত্তিক সমাজের কথা বলা হয় সেটা কেন? কারণ হচ্ছে পেশিশক্তি আর অর্থবিত্ত দিয়ে ওই চতুর্দ্দিষ্ট অর্জন সম্ভব নয়। সবচেয়ে বড় সমস্যা শান্তি-স্বস্তি নিয়ে। এ পরিস্থিতিতে করণীয় নিয়ে চিন্তাভাবনা হয়নি বা হচ্ছে না তা তো নয়। যখন কম্পিউটার উদ্ভাবনের সম্ভাবনা গণিতবিদরা জাগিয়ে তুলেছিলেন তখনই তারা বলেছিলেন সবকিছুকে সমন্বয় করতে হলে চাই সঠিক তথ্য-'স্বর্ণ আনুপাতিক তথ্য' অর্থাৎ নির্ভুল ও সূক্ষ্ণ হওয়া চাই। আর একটা প্রত্যয় ছিল-সবার কাছে কম্পিউটার বা গাণিতিক টার্মিনাল থাকা চাই। কিন্তু তা গান শোনা বা সিনেমা দেখার জন্য নয়, সঠিক ও সূক্ষ্ণ তথ্য সময়মতো দেয়া-নেয়ার জন্য।
একবিংশ শতাব্দীর এই পর্যায়ে প্রযুক্তির অনেক উন্নতি যে হয়েছে তা স্বীকার করতেই হবে। কিন্তু তথ্য দেয়া-নেয়া এবং জ্ঞানকে উন্নত করতে তার ব্যবহার করার বিষয়টা এখন পর্যন্ত রয়ে গেছে অনেকটাই প্রাথমিক পর্যায়ে। এ যেন অনেকটা নতুন প্রস্তর যুগের মানবকুলের মতো সুবিধামতো প্রস্তরখণ্ড পেয়েছে হাতে, কিন্তু বুঝতে পারছে না কোন দিকটা ধারালো করা যাবে সহজে। আর যতক্ষণ না তা ধারালো হচ্ছে ততক্ষণ তা থেকে যাবে খেলনা।
আমাদের মতো দেশে সমস্যা হচ্ছে-নিজেদের উদ্ভাসিত প্রযুক্তি আমরা ব্যবহার করছি না, ফলে অনেকেরই ধারণা জন্মেছে একটা কিছু পশ্চিমারা করে দেবেই। এখন আর এর সঙ্গে চীনাদের নামও যুক্ত হয়েছে। কিন্তু তারা যে উদ্ভাবনগুলো করেছে বা করছে তা কিসের জন্য? প্রথমত : কম্পিউটার এবং ইন্টারনেটের ইতিহাসটাই দেখুন-যুদ্ধজয়ের স্বার্থে যা পরবর্তীতে বাণিজ্যিক স্বার্থে পর্যবসিত হয়েছে। ওরা ওদের ভাষায় অযুত-নিযুত তথ্য দিয়ে জ্ঞানভাণ্ডার তৈরি করছে কিন্তু আমরা কী করছি?
অনেকেই এদেশে এখনও ভাবেন অচিরেই পশ্চিমারা আমাদের ভাষায় জ্ঞানভাণ্ডার প্রতিষ্ঠা করে দেবে। বলতে চাই না যে কিছু তারা করছে না বা করেনি। যতটুকু তারা করেছে তা তাদের বাণিজ্যিক স্বার্থেই করেছে। কিন্তু বাকিটুকু যে আমাদের করতে হবে! আমাদের তথ্য তো আমরা ছাড়া কেউ ভালো জানবে না। সবচেয়ে কষ্টকর বা দুঃখজনক হচ্ছে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটগুলো। সময়মতো আপডেট হয় না। একে তো ন্যাশনাল ডাটাবেজ নেই, তথ্যগুলোকে জ্ঞানে রূপান্তরের প্রক্রিয়াটাও শুরু হয়নি। তারপরও যেটুকু আছে সেটুকুর প্রতি না আছে মমতা না আছে নজরদারি।
এমন ছোট একটা দেশে উপজেলা-ইউনিয়ন পর্যন্ত প্রযুক্তির সুবিধা পৌঁছে দেয়া খুব একটা কঠিন কাজ নয়, বিষয়টা টেলিডেনসিটি দিয়ে প্রমাণ করা যায়। কিন্তু কাজের তথ্যের ব্যবহার বা দেয়া-নেয়াটাই এখন বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
থ্রিজি নিয়ে একটা বিতর্ক চলছে। অনেকে মনে করছেন সরকার থ্রিজি লাইসেন্স দিয়ে দিলে এ সমস্যার সমাধান অনেকটাই হয়ে যাবে। কিন্তু এটাও তো লক্ষ রাখতে হবে, থ্রিজি কী কী সুবিধা দেবে এবং সে সুবিধাগুলো ভোগ করার সঙ্গতি মানুষের আছে কি না অথবা সেগুলো ব্যবহার করে তারা লাভবান হবে কি না? এ আশঙ্কার প্রধান কারণ হচ্ছে আমাদের দেশে এবং পাশের দেশে নতুন যে প্রযুক্তিই আসছে তার বিনোদন মূল্য এবং 'ফালতু কথার' বিজ্ঞাপনই বেশি প্রচার করা হচ্ছে। ভারত যা করছে আমাদেরও তাই করতে হবে বা ওই ধরনের প্রযুক্তি-সুবিধা দিতে হবে এরকম একটা অভিমান অনেকের মধ্যেই আছে।
একসময় হয়ত বাস্তব অবস্থাটা ওরকম ছিল অর্থাৎ প্রাথমিক পর্যায়ের যোগাযোগ, বাজার সম্প্রসারণ ইত্যাদিতে আমাদের পশ্চাৎপদতা ছিল। কিন্তু এখন অবস্থাটা দু'বছর আগের মতোও নেই। এখানে অভাবনীয় মাত্রায় টেলিডেনসিটি বেড়েছে, কিন্তু ইন্টারনেট এক্সসেস বাড়েনি। অর্থাৎ প্রক্রিয়াজাতকরণ ও জ্ঞানভিত্তিক সুবিধা সরকারি-বেসরকারি কোনো তরফ থেকেই হয়নি। এক্ষেত্রে প্রধান বাধা সম্ভবত ভাষা এবং তথ্যভাণ্ডার। মানুষ ভাষার বাধার কারণে উপযোগিতা বুঝতে পারছে না। এখন মফস্বল শহর বা বিদ্যুৎ আছে এমন গ্রামের সচ্ছল অনেক পরিবারে কম্পিউটারের দেখা মেলে, কিন্তু সে কম্পিউটার ব্যবহার হয় সিনেমা দেখতে এবং গান শুনতে। রাজধানীরও বেশিরভাগ উচ্চশিক্ষিত ছেলেমেয়ে ইংরেজি-বাংলা টাইপও করতে পারে না, কিন্তু কোথাও চাকরির সিভি দিলে উইন্ডোজ ব্যবহারের সক্ষমতা উল্লেখ করে। কিন্তু ওই সক্ষমতা দিয়ে তারা গান বাজানো, সিনেমা দেখা ছাড়া বড়জোর ফেসবুক ওপেন করতে পারে। এমনকি মেইল ব্যবহারও করে না, ইংরেজি জানে না বলে ব্রাউজও করে না ওই ইংরেজির ভয়ে। এই পরিস্থিতিতে বিনোদন-সুবিধা আরও বাড়লে হয়ত পিসি বিক্রি, সেবা-বাণিজ্য আরও কিছুটা বাড়বে, কিন্তু তথ্যভাণ্ডার সমৃদ্ধ হবে, জ্ঞানচর্চা বাড়বে-এমন ধারণা করা বোধহয় ঠিক হবে না।
এখন বরং বাণিজ্যিক সুবিধাভোগীদের আরও সুবিধা দেয়ার চেষ্টার বদলে সরকারি-বেসরকারি সব মহল থেকেই বাংলা ভাষার ব্যবহার ইংরেজি ভাষায় স্বাচ্ছন্দ্য আনা এবং ওপেন সোর্স ব্যবহারের দিকে বিশেষ দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। এ বিষয়ে গবেষণা ও উন্নয়নের জন্য সরকারি উদ্যোগ এখন খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে। এটা একেবারে অভিনব ব্যাপার তা নয়, বহুদিন আগে থেকেই দেশে এ বিষয়ে আন্দোলনমুখী একটা উদ্যোগ লক্ষণীয়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে কিছু ব্যক্তিকে আন্দোলনকারী হিসেবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে মাত্র অথচ তাদেরকে যুক্তিসঙ্গত সহযোগিতা-পৃষ্ঠপোষকতা কিছুই প্রায় করা হয়নি। ফলে তৃণমূল পর্যন্ত আন্দোলনটা পৌঁছতে পারেনি। এ বিষয়টা নিয়ে ভাবতে হবে রাজনীতিবিদদেরও, কারণ তারাও এই সমস্যার মধ্যে আছেন।
আমরা যদি ভবিষ্যতের চিত্রটা একটু আঁচ করতে চেষ্টা করি, তাহলে দেখব আর কয়েক বছরের মধ্যেই আমাদের দেশেও হ্যান্ডি টার্মিনালের বাজার বাড়বে। থ্রিজি গবেষকরা এক সময় আসবেই এবং তা মোবাইলের মতো সেটেই ব্যবহার হবে, কিন্তু ভাষার স্বাচ্ছন্দ্য না এলে এবং যোগাযোগের উপযোগিতা তৈরি না হলে প্রকৃত তথ্য দেয়া-নেয়া হবে না, তথ্যগুলো প্রক্রিয়াজাত বা জ্ঞান উদ্রেককারী হয়ে উঠবে না।
গত কয়েক বছরের সরকারি পারফরম্যান্স পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে, আইসিটি ব্যবহারে অগ্রগণ্য অবস্থায় চলে গেছে আর্থিক খাত, বিশেষত ব্যাংকিং ও শুল্ক আদায় ব্যবস্থা। এটা অনেকটাই আন্তর্জাতিক সক্ষমতা অর্জনের জন্য হয়েছে। কিন্তু অভ্যন্তরীণভাবে শিক্ষা ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমে সমমাত্রিক ব্যবহার শুরু করা যায়নি। আর এ কারণেই পশ্চাৎপদতা, দারিদ্র্য, পরিবেশ বিপর্যয়-কোনো ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য সাফল্য আসেনি। আর বর্তমান বিশ্বে এ বিষয়গুলো একান্তভাবেই তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর কার্যক্রমে পরিণত করছে। জ্ঞান-প্রক্রিয়ার বাইরে থাকা মানুষ অল্প আঘাতেই হতবুদ্ধি হয়ে পড়ছে। কারণ আধুনিক সঙ্কট মোকাবেলার কৌশল তার আয়ত্তে নেই।
আসলে এই কৌশলটাই তাদের শেখাতে হবে এবং সেটা কম্পিউটার লিটারেসির মাধ্যমে। শিক্ষা সম্প্রসারণের আবশ্যিক অনুষদ অবশ্যই হতে হবে আইসিটি। আর এটা করার জন্য গবেষণা ও উন্নয়ন প্রক্রিয়াটাও এখনই শুরু করে দিতে হবে। পথচলা যে আমাদের অনেকটাই বাকি রয়ে গেছে তা বলাই বাহুল্য...তবে পথে আমরা নেমেছি-পাথেয়ও কিছু আছে, কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছতে হলে চলতে চলতেই কিছু অর্জন করতে হবে।
লেখক : সাংবাদিক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব

সর্বশেষ আপডেট ( বুধবার, 18 জুলাই 2012 06:28 )
 

বিকল্প কর্মসংস্থান আউটসোর্সিং

ইমেইল প্রিন্ট পিডিএফ

বাংলাদেশ আইসিটি খাতে দারুণ এগিয়েছে। এ দেশের ৭০ ভাগ প্রজন্মই তারুণ্যনির্ভর। তাই জনসংখ্যা এদেশের জন্য সমস্যা নয়। বরং সম্পদ। তবে সুদক্ষ আর পেশাভিত্তিক দক্ষতা ছাড়া এ সমস্যা জাতীয় সম্পদ হিসেবে কাজে আসবে না। এ জন্য সরকারকে প্রণোদনা প্যাকেজের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। এদেশের উৎসাহী তরুণরা ওডেস্কের তালিকায় নিজেদের শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করেছে। ওডেস্ক তাদের জন্য সশরীরে সনদ বয়ে এনেছে। এ সম্মাননায় বাংলাদেশের তরুণদের আরও উৎসাহিত হবে। কাজে উদ্যম আসবে।
এ সময় পুরো বিশ্বেই আউটসোর্সিং নির্ভরতা বাড়ছে। স্থির অফিসের তুলনায় এখন চলমান (ভার্চুয়াল) অফিস পদ্ধতিই জনপ্রিয় হচ্ছে। আর বাংলাদেশে এ কাজের জন্য চমৎকার পরিবেশ আছে। এ খাতে সুনির্দিষ্ট পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজন আছে। তরুণ উৎসাহ চায়। আর তা তাদের দিতে পারলেই যেকোনো অর্জনই সহজ হয়ে যাবে।
বাংলাদেশ গত তিন বছরে আউটসোর্সিংয়ে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ বাজার হিসেবে তুলে ধরেছে। বিশ্বের কোনো দেশই এখন আউটসোর্সিংয়ে বাংলাদেশকে খাটো করে দেখে না। বরং সর্বোচ্চ বিবেচনায় নিয়েছে। বিশ্বব্যাপী আউটসোর্সিংয়ের অর্ধেক বাজারই এখন ওডেস্কের দখলে। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশ এ কাজের জন্য সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। আর সাফল্যটাও নিঃসন্দেহে ঈর্ষণীয়। বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম আউটসোর্সিংবান্ধব। কিছু সীমাবদ্ধতা আর অদক্ষতা যে একেবারে নেই তা কিন্তু নয়। তবে তা কাটিয়ে ওঠা খুবই সম্ভব।
বাংলাদেশের জন্য অনলাইন অর্থনীতিতে গবেষণা এবং উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ। এরই মধ্যে বাংলাদেশ 'সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন' (এসইও) খাতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। তবে এ সীমাবদ্ধতা অচিরেই কাটিয়ে উঠতে হবে। আউটসোর্সিং চাকরিতে আরও সুদক্ষ জায়গায় বাংলাদেশের তরুণদের প্রবেশ করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের আউটসোর্সিং কন্ট্রাক্টররা ঘণ্টায় ন্যূনতম ১৫ থেকে ২০ ডলার আয় করে। বাংলাদেশে কন্ট্রাক্টররা ঘণ্টায় ন্যূনতম ৫ থেকে ১০ ডলার আয় করছে।
তবে বাংলাদেশে অনলাইন পেমেন্টে জটিলতা আছে। এ প্রসঙ্গে আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠান ওডেস্কের সহসভাপতি ম্যাট কুপার বলেন, পেপল অ্যান্ড পেপল। এটা সত্যিই বড় ধরনের বাধা। এ নিয়ে ওডেস্ক সরকারের সঙ্গে 'ডায়ালগ ওপেন' করেছে। অচিরেই গ্লোবাল ব্যাংকের মাধ্যমে বাংলাদেশে ওডেস্ক তাদের পেমেন্ট পদ্ধতি চালু করার চেষ্টা করছে। এটি সম্ভব হলে বাংলাদেশে আউটসোর্সিংয়ে তাদের সবচেয়ে বড় বাধাটি অতিক্রম করবে। তখন আরও বেশি তরুণ এ খাতে আগ্রহী হয়ে উঠবে।
ওডেস্কের কাজের জন্য অনেক তরুণ তাদের নিয়মিত পড়াশোনায় অমনোযোগী হয়ে উঠছে-এ প্রশ্নের সদুত্তরে ম্যাট কুপার বলেন, সবার আগে একাডেমিক পড়াশোনা। কোনোভাবেই নিয়মিত শিক্ষার বাইরে গিয়ে আউটসোর্সিংয়ে মনোযোগী হওয়ার চেষ্টা করা উচিত নয়।
ওডেস্ক কন্ট্রাক্টর কমিউনিকেশনের মুখপাত্র মনিকা চুয়া জানালেন, শুধু কাজ জানলে আর কাজের খবর রাখলেই আউটসোর্সিংয়ে ভালো করা যায়, তা কিন্তু নয়। আউটসোর্সিং মার্কেটপ্লেসে নিজের দক্ষতা আর যোগ্যতার সঙ্গে কাজের সমন্বয় করাটাও একটি বিশেষ গুণ। বাংলাদেশের উদীয়মান তরুণদের এ অংশে একটা ঘাটতি লক্ষ করা যায়। এখানে তরুণরা একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল। নিজে থেকে জানার আগ্রহটা অনেকেরই একটু কম। এ জন্য শুধু সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন নিয়েই বেশি কাজ হচ্ছে বাংলাদেশে।
২০১৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বর্তমান আউটসোর্সিং বাজারে দ্বিগুণ দখলে নেবে। এ বিশাল বাজার পেতে অনেক আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠানই বাংলাদেশকে গুরুত্ব দিচ্ছে। ওডেস্কের শীর্ষ দুই কর্মকর্তার সাম্প্রতিক বাংলাদেশ সফরে এ আভাসই সুস্পষ্ট হয়েছে।
এ সম্ভাবনাকে শুধু কাগজে-কলমে আর সমীকরণে না নিয়ে বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ জরুরি। সম্ভাবনাময় এ বাজার থেকে বাংলাদেশ বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে পারবে। এ জন্য সরকারি উৎসাহ আর উদ্যোগ একান্ত প্রয়োজন। বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে আউটসোর্সিং পেমেন্ট পদ্ধতি উন্মুক্ত আর সহজ হলে বাংলাদেশ দ্রুতই এ খাতে আরও চমক দেখাবে। এমন প্রত্যাশাই রেখে গেছেন ম্যাট কুপার।
বিশ্বের শীর্ষ আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠান ওডেস্কের সহসভাপতি ম্যাট কুপার। এখন বিশ্বব্যাপী বিকল্প কর্মসংস্থান হিসেবে সবচেয়ে জনপ্রিয় মাধ্যম আউটসোর্সিং। ওডেস্কের তালিকায় বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ তিনে অবস্থান করছে।
২০০৯ সালে বাংলাদেশে ওডেস্ক পরিচিতি পায়। মাত্র তিন বছরে ওডেস্কের পুরো কাজের ১২ ভাগ দখলে নিয়েছে বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় তরুণ প্রযুক্তিবিদেরা। কিন্তু প্রথম স্তরে এ সংখ্যা ছিল মাত্র ২ ভাগ। আউটসোর্সিংয়ের বিভিন্ন সম্ভাবনায় বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন ম্যাট কুপার। ভবিষ্যৎ বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ বাজার হিসেবে বিবেচনা করছে ওডেস্ক। এ জন্যই সফরে এসেছেন ওডেস্কের দু'জন শীর্ষ যোগাযোগ কর্মকর্তা। এ সফরে কুপারের সঙ্গে এসেছেন ওডেস্কের কন্ট্রাক্টর কমিউনিকেশনের মুখপাত্র মনিকা চুয়া। তিনিও বাংলাদেশের দারুণ সব সম্ভাবনার কথাই বলেছেন।
বাংলাদেশের ৭০ ভাগ জনসংখ্যা তরুণ। বিশ্বের খুব কম দেশেরই এ শক্তি আছে। একে 'যুব শক্তি' বলে অভিহিত করেন আউটসোর্সিং বিশ্বের স্বনামধন্য কুপার। এর আগেও গত ডিসেম্বরে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত ই-এশিয়া সফরে এসে লাখ লাখ তরুণকে মাতিয়ে গেছেন। করেছেন আউটসোর্সিংয়ের কাজ। জানিয়েছেন বিকল্প কর্মসংস্থানের কথা। জয় করতে বলেছেন হতাশা আর বেকারত্বকে। হাসি আর সুস্পষ্ট বাক্য তরুণরা সহজেই বুঝতে পারে। এ অর্থে বাকপটু আর মিষ্টভাষী কুপারের মতো ব্যক্তিত্ব বাংলাদেশে খুব কমই এসেছেন।
বাংলাদেশের এ খাতে ৫ হাজার কোটি টাকার আয় করার সুযোগ আছে। এটি দ্বিগুণ হলেও কোনো অবাক করার মতো ঘটনা ঘটবে না। এ মুহূর্তে বাংলাদেশের লাখ লাখ তরুণ-তরুণী ওডেস্কের জন্য কাজ করছে। আর আয়ও করছে তুলনামূলক অনেক ভালো। গড়ে বাংলাদেশে ওডেস্কের প্রতিটি কর্মী ৬ হাজার টাকার মতো মাসিক আয় করছেন। এটি সম্ভাবনার শুরু মাত্র। এ মুহূর্তে অনলাইন চাকরিতে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি কাজ করছে 'সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন' খাতে। এটি সহজেই করা যায় বলে এ বিভাগে তরুণরা আকৃষ্ট হয়।
তবে অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ, ট্রেড এন্ট্রি, পিএইচপি কোডিং এবং সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট খাতে আরও বেশি তরুণ আগ্রহী হলে গুণগত এবং দক্ষ কর্মী তৈরি করা সম্ভব। তখন ঘণ্টাভিত্তিক আয় ১০ ডলার থেকে বেড়ে ১০০ ডলার পৌঁছতে পারে। বাংলাদেশের তরুণদের এ ধরনের যোগ্যতা এবং দক্ষতা আছে বলে ম্যাট কুপার জানান। বাংলাদেশের তরুণ সমাজ অনেক বেশি মেধাবী এবং সম্ভাবনাময়। এদের শুধু সঠিক ক্যারিয়ারভিত্তিক দিকনির্দেশনা দিলেই বেকারত্বে বিপরীতে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
ওডেস্ক ওয়ার্ল্ড ওয়ার্কর্ যাঙ্কিংয়ে মাত্র তিন বছরে শীর্ষ তিনে উঠে আসা এরই বাস্তব প্রমাণ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আউটসোর্সিংয়ে বাংলাদেশ এখন জব রেন্টারদের কাছে বিশ্বব্যাপী পরিচিত এবং জনপ্রিয়। বাংলাদেশে শাখা অফিস করার কোনো পরিকল্পনা আছে কি না-এ প্রশ্নের জবাবে ম্যাট কুপার বলেন, আমাদের তো অফিস আছে সব খানেই। তবে তা ভার্চুয়াল এবং গ্লোবাল। অফিসহীন কাজকেই তো 'আউটসোর্সিং' বলে। এখানে দেশ কোনো বিষয় নয়। সময়মতো সঠিক কাজ আর দক্ষতাই এখানে মুখ্য বিষয়।
এ সফরে 'কন্ট্রাক্টর অ্যাপ্রিসিয়েশন ডে' উপলক্ষে বাংলাদেশের শীর্ষ দু'শতাধিক তরুণকে সার্টিফিকেট বিতরণ করেন ওডেস্কের মার্কেটপ্লেস অপারেশন্সের সহসভাপতি ম্যাট কুপার। এ সময় বাংলাদেশ এ মুহূর্তে ওডেস্কের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ কর্মবাজার বলে অভিহিত করেন কুপার। অচিরেই আবারও বাংলাদেশ সফরে আসার দৃঢ় ইচ্ছা ব্যক্ত করেন কুপার। তবে এর মধ্যে অনেকগুলো দেশ ভ্রমণের কথাও জানান ম্যাট কুপার।
লেখক : আইসিটি এডিটর

সর্বশেষ আপডেট ( বুধবার, 18 জুলাই 2012 07:00 )
 

অর্থনীতির লাইফলাইন হবে তথ্যপ্রযুক্তি

ইমেইল প্রিন্ট পিডিএফ

বেসিসের বর্তমান সদস্যসংখ্যা হচ্ছে ৫৩০টি কোম্পানি। এটা ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন হওয়ায় কোম্পানিগুলোই মূলত এর সদস্য। ৫৩০টি কোম্পানির মধ্যে ১২০টি বিশ্বের ২৩টি দেশে নিয়মিত সফটওয়্যার রফতানি করছে। আমাদের রফতানির পরিমাণ ছিল বছরে ৩০ থেকে ৩৫ মিলিয়ন ডলার। কিন্তু চলতি বছরের ছয় মাসেই ৩০ মিলিয়ন ডলারের সফটওয়্যার রফতানি ইতোমধ্যেই করা হয়েছে। আমরা আশা করছি এ বছর রফতানির পরিমাণ ৫০ থেকে ৬০ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়াবে। এ রফতানির মধ্যে শুধু আমাদের কোম্পানিগুলোর রফতানির পরিমাণ দেখানো হয়েছে। এ পরিমাণ হচ্ছে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের দেয়া হিসাবে অনুযায়ী রফতানির পরিমাণ। এর বাইরে ফ্রিল্যান্সারদের যে আয় রয়েছে সেটা এখানে অন্তর্ভুক্ত নয়। আমাদের এখানে পেপাল বা এ ধরনের কোনো সুবিধা না থাকায় তাদের আয়টা বিভিন্ন মাধ্যমে এসে থাকে। অফিসিয়াল এক্সপোর্ট আর্নিংয়ের বাইরে যে এক্সপোর্ট রয়েছে সেটা এখনো পর্যন্ত আমরা ক্যাটারাইজেশনের কাজ করছি। এতে আমার মনে হয় এক্সপোর্টের পরিমাণ আরো বাড়বে। আসলে আমাদের দেশের কোম্পানিগুলোর বেশিরভাগই হচ্ছে স্থানীয় বাজারকেন্দ্রিক। তবে আমাদের আইটি ইন্ডাস্ট্রির শুরুটাই হয়েছিল কিছুটা এক্সপোর্ট মার্কেটকে টার্গেট করে। এ কারণে এক্সপোর্ট মার্কেটের হিসাবটা বলা যায়। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে দেশকে ডিজিটাল বাংলাদেশ হিসেবে ঘোষণা দেয়ার পর স্থানীয় বাজারের বিস্তার ঘটেছে। সরকারের বেশ কিছু উদ্যোগ বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এটুআই এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তারা বেশ কিছু নতুন প্রকল্প নিয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়কে প্রণোদনা দিয়েছে। গত তিন বছর ধরে তারা ডিজিটাল উদ্ভাবনী মেলা করছে। এর ফলে আইটি ব্যবহার অনেক বেড়েছে। সেই সঙ্গে গত ১০ বছরে বাংলাদেশে একটা বড় ধরনের আইটি বিপ্লব ঘটে গেছে। সেটা হচ্ছে মোবাইল ফোনের ব্যবহার বেড়েছে। প্রায় নয় কোটি মানুষ এখন মোবাইল ফোন ব্যবহার করছেন। অর্থাৎ ৫০ ভাগের বেশি মানুষ এখন মোবাইল ব্যবহার করছেন। মোবাইল ফোন শুধু কথা বলার জন্য নয়, এর মাধ্যমে টেক্সট যাচ্ছে, ইন্টারনেট ব্যবহার হচ্ছে। অর্থাৎ এর মাধ্যমে মানুষের সম্পূর্ণ জীবনযাত্রাই বদলে গেছে। এখন আবার মোবাইলে লেনদেন, বেচাকেনা, ব্যাংকিং শুরু হচ্ছে। পত্রিকাগুলো মোবাইলে চলে আসছে। ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যাও গত তিন বছরে অনেক বেড়েছে। এখন প্রায় মোট জনসংখ্যার ২০ ভাগ অর্থাৎ প্রায় তিন কোটি ২০ লাখ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন। ফেসবুক ব্যবহারকারী রয়েছেন প্রায় ৩০ লাখ। এটা এশিয়ার মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যা। সবচেয়ে বড় কথা যে দেশের জনসংখ্যার ৫০ শতাংশের বয়স ২৫ বছরের নিচে সেই দেশে যদি প্রযুক্তিকে আমরা বাহন হিসেবে ধরি, তাহলে আমাদের অর্থনীতির চেহারা একেবারে পুরোপুরি বদলে যেতে পারে। এ কারণে আমরা মনে করি পাঁচ থেকে সাত বছর বা বড়জোর দশ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতির লাইফলাইন হবে তথ্যপ্রযুক্তি। এটিকে যদি আমরা একটু সুগঠিত এবং পদ্ধতি অনুসরণ করে দাঁড় করাতে পারি তাহলে দেশের চেহারা বদলে যাবে। আমাদের অনেক অর্জন রয়েছে। এই অর্জনগুলোকে যদি ঠিকমতো দাঁড় করানো যায় তাহলে আমরা অচিরেই তারুণ্যের জয়যাত্রায় একটা জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি নিয়ে খুব সুন্দরভাবে দেশটাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারব। সরকারের দিক থেকে কতগুলো ইতিবাচক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। প্রথমত জাতীয় তথ্যপ্রযুক্তি নীতিমালা ২০০৯ প্রণয়ন করা হয়েছে। এটা খুবই ইতিবাচক বিষয়। কারণ এতে ৩০৬টি অ্যাকশন আইটেম রয়েছে। এটিই সরকারের একমাত্র নীতিমালা, যেখানে অ্যাকশন আইটেম দেয়া আছে। যেমন একটি অ্যাকশন আইটেমে বলা হয়েছে ইন্ডাস্ট্রি ডেভেলপ করার জন্য আইটি ইন্ডাস্ট্রি ডেভেলপমেন্ট অথরিটি করা হবে। হাইটেক পার্ক করার জন্য হাইটেক পার্ক অথরিটি করা হবে। হাইটেক পার্ক অথরিটি ইতোমধ্যেই করা হয়েছে। আইটি ইন্ডাস্ট্রি ডেভেলপমেন্ট অথরিটি এখনো হয়নি। তবে এর জন্য ১০০ মিলিয়ন ডলার অর্থাৎ বর্তমান হিসাবে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা আছে। দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে এটি নীতিমালায় রয়েছে। কিন্তু বাজেটে এর কোনো প্রতিফলন নেই। যে কারণে গত তিন বছর ধরে বাজেটের সময় আমরা বলে আসছি যে আমরা নতুন কোনো কিছু দাবি করছি না। আমরা চাচ্ছি পলিসিতে যা রয়েছে সেটার প্রতিফলন যাতে জাতীয় বাজেটে থাকে। যেমন নীতিমালায় রয়েছে নিয়মিত বাজেটের এক শতাংশ এবং উন্নয়ন বাজেটের দুই শতাংশ আইটির জন্য ব্যবহার হবে। কোনো একটা দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি সমন্বয় করতে হবে। কোনো একটা মন্ত্রণালয় হয়তো ১ শতাংশের বেশি ব্যয় করছে, কিন্তু কেউ সেটা পর্যবেক্ষণ করছে না। আইটি মিনিস্ট্রি কিন্তু পূর্ণ একটি স্বতন্ত্র মন্ত্রণালয়। আগে এটি বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে থাকলেও এটি এখন আলাদা করে পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রণালয় করা হয়েছে। তবে দুঃখজনক হচ্ছে এ মন্ত্রণালয়ে বসার কোনো জায়গা নেই। এখনো কম্পিউটার কাউন্সিলের একটি কক্ষে মন্ত্রী মহোদয় বসেন আর ব্যান্সডকের একটি অফিসে সচিব মহোদয় বসেন। যে নীতিগুলো রয়েছে আর যে পদক্ষেপগুলো নেয়া হয়েছে সেগুলো সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন একটি ডিজিটাল টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। এর প্রথম মিটিংয়ে আমরা পরিত্যক্ত ভবন জনতা টাওয়ারটিকে আইটি পার্ক করার প্রস্তাব করলাম। প্রধানমন্ত্রী ওই মিটিংয়েই তিন মিনিটের মধ্যে এ ব্যাপারে অনুমোদন দিয়ে দিলেন। কিন্তু দুই বছরের মধ্যেও সেটি সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক হয়নি। গত ১০ জুন পার্ক ডেভেলপাররা চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন। কাজেই এটা হবে। হাইটেক পার্ক অথরিটি তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু বাজেটে এর কোনো বরাদ্দ দেখিনি।
আমাদের অস্বাভাািবক অগ্রগতি হতে পারতো। আসলে এই ইন্ডাস্ট্রিটা বা সেক্টরটির উন্নয়নের জন্য মূলত দুটি জিনিস দরকার। সেটি হলো মানবসম্পদ এবং অবকাঠামো। মানবসম্পদের কথা তো আমি আগেই বলেছি মোট জনসংখ্যার ৫০ ভাগের বয়স হচ্ছে ২৫ বছরের নিচে। এ ইন্ডাস্ট্রি ডেভেলপ করার জন্য শুধু কম্পিউটার সায়েন্সের শিক্ষার্থী লাগবে তা নয়। যেকোনো বিভাগ থেকে পড়াশোনা করে এসে আইটির উন্নয়নের জন্য কাজ করতে পারেন। আইটিকে নিজের পেশা হিসেবে বেছে নিতে পারেন। আমাদের তরুণ প্রজন্ম এতই বুদ্ধিমান, সৃজনশীল এবং মেধাবী যে, তারা যেকোনো ধরনের চ্যালেজ্ঞ মোকাবেলা করতে পারেন। তাই এটিকে যদি আমরা কাজে লাগাতে পারতাম বা এখনো যদি পারি তাহলে আমরা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে একেবারে বদলে দিতে পারব। কিন্তু এজন্য প্রয়োজন সমন্বয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন রয়েছে, আইসিটি মন্ত্রণালয় রয়েছে, কম্পিউটার কাউন্সিল রয়েছে, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় রয়েছে সেগুলোর আইটি বাজেট রয়েছে। এসব কিছুর মধ্যে সমন্বয করা হচ্ছে না। এত সব দুর্বলতা সত্ত্বেও আমরা কিন্তু এগিয়ে যাচ্ছি। আমাদের এখানে ৮০০ বা ১০০০-এর মতো কোম্পানি রয়েছে। আমাদের শত সদিচ্ছা থাকলেও এদের সবাইকে আলাদাভাবে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ এবং হাই ব্যান্ডউইডথের ইন্টারনেট দিতে পারব না। কিন্তু ৮০০ কোম্পানি যদি আটটি ভবনে থাকে তাহলে একে কিন্তু বিশেষভাবে চিহ্নিত করে সেখানে বিদ্যুৎ এবং ইন্টারনেট সংযোগ নিশ্চিত করে দেয়া সম্ভব। ভারতের অত্যন্ত পশ্চাৎপদ এলাকা শিলিগুড়িতেও সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক রয়েছে, হাইটেক পার্ক রয়েছে এবং ইনকিউবেটর রয়েছে। এ ধরনের অবকাঠামো আমাদের এখানে নেই। এ অবকাঠামো আমরা দাঁড় করাতে না পারলে আমাদেন আন্তর্জাতিক মার্কেটে বিচরণ করার যে সম্ভাবনা রয়েছে সেটা হারাব। গত বছরের আগের বছর কনসালট্যান্ট কোম্পানি গার্ডনার প্রথমবারের মতো বাংলাদেশকে অন্যতম একটি আউটসোর্সিং দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তরুণ জনগোষ্ঠীর কাজের স্বীকৃতি হিসেবেই তারা এ স্বীকৃতি দিয়েছে। আমাদের তিনটি স্থানে বেশ দুর্বলতা রয়েছে-অবকাঠামো, ইংরেজি ভাষাগত দক্ষতা এবং মেধাস্বত্ব্ব আইন। এগুলো নিশ্চিত করা হলে আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের বড় ধরনের একটি সুযোগ সৃষ্টি হবে। সরকার যখন পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের কথা বলেছে সেটা যদি আইটি সার্ভিসে সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায় তাহলে সেটা পুরো চিত্রটাই বদলে দেবে। শুধু অর্থনীতি নয়, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, কার্যক্রম মনিটর করা যাবে, শিক্ষার লেভেল বাড়বে। আর এসব আবার রফতানি বাড়াতে সহযোগিতা করবে। সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে ইচ্ছুক, তারা আইটির জন্য আলাদা একটি মন্ত্রণালয়ও করেছে। অথচ তাদের বসার কোনো জায়গা নেই।
বর্তমানে সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী সেক্টর গার্মেন্ট সেক্টরের চেয়ে বেশি সম্ভাবনাময় হচ্ছে আইটি সেক্টর। আমি নিশ্চিত যে ১০ বছরের মাথায় এখন যে গার্মেন্টের ২০ বিলিয়ন ডলারের মার্কেট রয়েছে এটাকে আইটি ছাড়িয়ে যেতে পারবে। সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে চাইছে। কিন্তু সরকারের মেশিনারি দিয়ে এটা হবে না। কারণ প্রত্যেকটি মন্ত্রণালয়ে যে আইটি অর্গানোগ্রাম রয়েছে তাতে একজন সিস্টেম অ্যানালিস্ট, এক বা একাধিক প্রোগ্রামার এবং কিছুসংখ্যক অপারেটর থাকেন। পুরো ডিরেক্টরি হিসাব করলে দেখা যাবে এখানে ৬৫১ জন আছেন। এ ৬৫১ জনকে দিয়ে কি ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়া যাবে? এজন্য প্রত্যেকটি মন্ত্রণালয়ে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপে ম্যানেজ সার্ভিস প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এর ফলে দেশে অভিজ্ঞতা অর্জনের পাশাপাশি বিদেশেও সুযোগ বাড়বে। এখন বিভিন্ন ফিল্যান্সিং সাইটগুলোর রেটিংয়েও প্রথম ১০ জনের মধ্যে ২/৪ জন বাংলাদেশী অবস্থান করছেন। এখন ফ্রিল্যান্সিং নিয়ে সারা দেশে এমনকি প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও বড় ধরনের প্রতারণা চলছে। এটাকে রোধ করা না গেলে আমাদের সম্ভাবনাটাই নষ্ট হয়ে যাবে। এ সম্পর্কে সবাইকে জানানোর জন্য আমাদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা কর্মসূচি গ্রহণ করেছি। এ ফ্রিল্যান্সিং এবং আউটসোর্সিংটা আমাদের জন্য একটা সামাজিক বিপ্লব বয়ে আনতে পারে। আর প্রতারণার শিকার হলে এটা আমাদের জন্য ধ্বংস বয়ে আনতে পারে।
আইসিটি খাতের সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে মাইন্ডসেট। যারা বয়সে প্রবীণ তারা মনে করেন তারা পারবেন না। এটা তাদের জন্য নয়, তরুণ প্রজন্মের জন্য। দ্বিতীয়ত হচ্ছে স্বচ্ছতা। একটা অংশ রয়েছে যারা মনে করে আইসিটির কারণে স্বচ্ছতা বেড়ে যাবে, অনেক ধরনের অনিয়ম বন্ধ হযে যাবে, অনেকে মনে করে তাদের কর্তৃত্ব থাকবে না। তৃতীয়ত এর জন্য সরকারের যে স্ট্রাকচার বা অর্গানোগ্রাম থাকা দরকার সেটা নেই। বিষয়গুলো দূর করা গেলে ডিজিটাল বাংলাদেশের প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর হয়ে যাবে। এ ইন্ডাস্ট্রির জন্য বিদ্যুৎ একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এর প্রসারের জন্য বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান করতেই হবে।

সর্বশেষ আপডেট ( বুধবার, 18 জুলাই 2012 06:55 )
 

তৈরি হচ্ছে মস্তিষ্কের সমকক্ষ কম্পিউটার

ইমেইল প্রিন্ট পিডিএফ

মানব মস্তিষ্কের রোগ নিরাময়ে 'সুপার কম্পিউটার'! আন্তর্জাতিক একদল গবেষকের দাবি মেনে নিলে ও গবেষণা সফল হলে শিগগিরই মানব মস্তিষ্কের সমকক্ষ হয়ে উঠতে চলেছে ওই সুপার কম্পিউটার। গবেষকরা জানিয়েছেন, একটি পরিণত মানব মস্তিষ্কে প্রায় ১০ হাজার কোটি নিউরন থাকে। আর এরা একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত। প্রতিটি নিউরন প্রতি সেকেন্ডে কয়েকশ' কোটি ধরনের হিসাব করে থাকে। আর প্রতি মুহূর্তে মস্তিষ্কের সব নিউরনের সম্মিলিত কর্মকাণ্ড এখনও রহস্যে মোড়া। আর সেই রহস্য উন্মোচনেরই চেষ্টা চলছে জার্মানিতে।
কাজটা অবশ্য করছেন ইউরোপের বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা মিলে। তাদের দাবি, এমআরআইয়ের মাধ্যমে প্রথমে মানব মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের ত্রিমাত্রিক ছবি তোলা হয়েছে। এরপর বিভিন্ন উদ্দীপনায় প্রতিটি নিউরন ঠিক কীভাবে সাড়া দেয়, সেই তথ্য জোগাড় করে একটি সুপার কম্পিউটারে তুলে রাখার চেষ্টা করছেন বিজ্ঞানীরা।
সেই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ওই সুপার কম্পিউটারের মাধ্যমে মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ নিজেদের মধ্যে কীভাবে সংযোগ রক্ষা করে তা-ও পরীক্ষা করে দেখছেন জার্মানির ডাসেলডর্ফের বিজ্ঞানীরা। দলের প্রধান গবেষক সুইজারল্যান্ডের বিজ্ঞানী হেনরি মারক্রাম জানান, বছর বারোর মধ্যেই গবেষণা শেষ হয়ে যাবে বলে তাদের আশা।
মারক্রাম জানালেন, গবেষণা সফল হলে মস্তিষ্কের বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা অনেক সহজ হয়ে যাবে। এমনকি নিউরনের বিভিন্ন ওষুধ মানবদেহের ওপর পরীক্ষা করার ক্ষেত্রে যেসব বিধিনিষেধ আছে তা-ও থাকবে না। কারণ এই গবেষণার ভিত্তিতে তৈরি করা যাবে রোবট, যার আচার-আচরণ হবে একেবারে মানুষের মতো। ফলে এর ওপরই বিভিন্ন ওষুধের প্রভাব পরীক্ষা করা যাবে। এর আগে মারক্রাম ও তার নেতৃত্বে একদল গবেষক ১৫ বছর ধরে ইঁদুরের মস্তিষ্কের ওপর পরীক্ষা চালিয়েছিলেন। কিন্তু মানুষের মস্তিষ্ক নিয়ে গবেষণা করা যে এর থেকে অনেক কঠিন তা মেনে নিয়েছেন মারক্রাম।
জার্মানির সংবাদমাধ্যম মজা করে ওই গবেষক দলের নাম দিয়েছে 'টিমফ্রাঙ্কেনস্টাইন'। কারণ গবেষকদের দাবি, এই গবেষণা সফল হলে মস্তিষ্কের কাজকর্ম নকল করে কম্পিউটাররা নিজে নিজেই চিন্তাভাবনা করতে পারবে। এই গবেষণার জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের তরফ থেকে একশ' কোটি ইউরো সাহায্যের কথা ঘোষণা করা হয়েছে।
প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে প্রায় ২০০ কোটি মানুষ অ্যালঝেইমার্স, স্কিটজোফ্রেনিয়াসহ মস্তিষ্কের কোনো না কোনো রোগে আক্রান্ত হন। কিন্তু বেশিরভাগের রোগই সময়মতো চিহ্নিত হয় না। ফলে মস্তিষ্কের রোগের বিষয়টি ক্রমেই জটিল আকার ধারণ করছে। আর তাই এই গবেষণার সাফল্যের ওপরই হয়তো নির্ভর করছে কোটি কোটি মানুষের ভবিষ্যৎ। তবে ওই সুপার কম্পিউটারের কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ জোগাড় করাটাই এখন সব থেকে বড় চ্যালেঞ্জ।
মারক্রামের সহকারী বিজ্ঞানী রিচার্ড ওয়াকার জানালেন, কাজ চালানোর জন্য মস্তিষ্ক যন্ত্রটির বিদ্যুৎ লাগে নামমাত্র। আর তা কাজ করে চলে নব্বই-একশ' বছর। অথচ সেই কাজ করতে সুপার কম্পিউটারের লেগে যাবে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ। রিচার্ডের মতে, মস্তিষ্ক এত কম শক্তিতে কী করে কাজ চালাতে পারে তা যদি একবার জানা যায়, তবে হয়তো পৃথিবীর শক্তির চাহিদা মেটানোর পথ খুলে যেতে পারে।

সর্বশেষ আপডেট ( বুধবার, 18 জুলাই 2012 05:45 )
 

সংস্করণ প্রাকদর্শন

  • দ্বিতীয় সংস্করণ
    আপনার দ্বিতীয় সংস্করণ সংগ্রহ করুন

আজকের জরিপ

প্রথম সংস্করণ কেমন লেগেছে?
 

অনলাইনে আছেন

আমাদের সাথে আছে 12 অতিথি অনলাইন

সংবাদজ্ঞাপন

জুলাই মাস পর্যন্ত 50% বিজ্ঞাপন ডিসকাউন্ট

Banner Sizes/Rates

Center of Page - 468 pixels x 60 pixels (full banner):  (minimum)@5000Tk - 5000TK

 

Middle Page - 468 pixels x 60 pixels (full banner):  (minimum)@2000Tk -2000TK

 

Right Hand Column - 210 pixels x 60 pixels (full banner):  (minimum)@3000Tk - 5000TK

left Hand Column - 300 pixels x 60 pixels (full banner):  (minimum)@3000Tk - 5000TK

Facebook FanBox

You are here: Home

ব্যানার স্লাইডার