অর্থনীতির লাইফলাইন হবে তথ্যপ্রযুক্তি

ইমেইল প্রিন্ট পিডিএফ

বেসিসের বর্তমান সদস্যসংখ্যা হচ্ছে ৫৩০টি কোম্পানি। এটা ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন হওয়ায় কোম্পানিগুলোই মূলত এর সদস্য। ৫৩০টি কোম্পানির মধ্যে ১২০টি বিশ্বের ২৩টি দেশে নিয়মিত সফটওয়্যার রফতানি করছে। আমাদের রফতানির পরিমাণ ছিল বছরে ৩০ থেকে ৩৫ মিলিয়ন ডলার। কিন্তু চলতি বছরের ছয় মাসেই ৩০ মিলিয়ন ডলারের সফটওয়্যার রফতানি ইতোমধ্যেই করা হয়েছে। আমরা আশা করছি এ বছর রফতানির পরিমাণ ৫০ থেকে ৬০ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়াবে। এ রফতানির মধ্যে শুধু আমাদের কোম্পানিগুলোর রফতানির পরিমাণ দেখানো হয়েছে। এ পরিমাণ হচ্ছে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের দেয়া হিসাবে অনুযায়ী রফতানির পরিমাণ। এর বাইরে ফ্রিল্যান্সারদের যে আয় রয়েছে সেটা এখানে অন্তর্ভুক্ত নয়। আমাদের এখানে পেপাল বা এ ধরনের কোনো সুবিধা না থাকায় তাদের আয়টা বিভিন্ন মাধ্যমে এসে থাকে। অফিসিয়াল এক্সপোর্ট আর্নিংয়ের বাইরে যে এক্সপোর্ট রয়েছে সেটা এখনো পর্যন্ত আমরা ক্যাটারাইজেশনের কাজ করছি। এতে আমার মনে হয় এক্সপোর্টের পরিমাণ আরো বাড়বে। আসলে আমাদের দেশের কোম্পানিগুলোর বেশিরভাগই হচ্ছে স্থানীয় বাজারকেন্দ্রিক। তবে আমাদের আইটি ইন্ডাস্ট্রির শুরুটাই হয়েছিল কিছুটা এক্সপোর্ট মার্কেটকে টার্গেট করে। এ কারণে এক্সপোর্ট মার্কেটের হিসাবটা বলা যায়। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে দেশকে ডিজিটাল বাংলাদেশ হিসেবে ঘোষণা দেয়ার পর স্থানীয় বাজারের বিস্তার ঘটেছে। সরকারের বেশ কিছু উদ্যোগ বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এটুআই এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তারা বেশ কিছু নতুন প্রকল্প নিয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়কে প্রণোদনা দিয়েছে। গত তিন বছর ধরে তারা ডিজিটাল উদ্ভাবনী মেলা করছে। এর ফলে আইটি ব্যবহার অনেক বেড়েছে। সেই সঙ্গে গত ১০ বছরে বাংলাদেশে একটা বড় ধরনের আইটি বিপ্লব ঘটে গেছে। সেটা হচ্ছে মোবাইল ফোনের ব্যবহার বেড়েছে। প্রায় নয় কোটি মানুষ এখন মোবাইল ফোন ব্যবহার করছেন। অর্থাৎ ৫০ ভাগের বেশি মানুষ এখন মোবাইল ব্যবহার করছেন। মোবাইল ফোন শুধু কথা বলার জন্য নয়, এর মাধ্যমে টেক্সট যাচ্ছে, ইন্টারনেট ব্যবহার হচ্ছে। অর্থাৎ এর মাধ্যমে মানুষের সম্পূর্ণ জীবনযাত্রাই বদলে গেছে। এখন আবার মোবাইলে লেনদেন, বেচাকেনা, ব্যাংকিং শুরু হচ্ছে। পত্রিকাগুলো মোবাইলে চলে আসছে। ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যাও গত তিন বছরে অনেক বেড়েছে। এখন প্রায় মোট জনসংখ্যার ২০ ভাগ অর্থাৎ প্রায় তিন কোটি ২০ লাখ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন। ফেসবুক ব্যবহারকারী রয়েছেন প্রায় ৩০ লাখ। এটা এশিয়ার মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যা। সবচেয়ে বড় কথা যে দেশের জনসংখ্যার ৫০ শতাংশের বয়স ২৫ বছরের নিচে সেই দেশে যদি প্রযুক্তিকে আমরা বাহন হিসেবে ধরি, তাহলে আমাদের অর্থনীতির চেহারা একেবারে পুরোপুরি বদলে যেতে পারে। এ কারণে আমরা মনে করি পাঁচ থেকে সাত বছর বা বড়জোর দশ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতির লাইফলাইন হবে তথ্যপ্রযুক্তি। এটিকে যদি আমরা একটু সুগঠিত এবং পদ্ধতি অনুসরণ করে দাঁড় করাতে পারি তাহলে দেশের চেহারা বদলে যাবে। আমাদের অনেক অর্জন রয়েছে। এই অর্জনগুলোকে যদি ঠিকমতো দাঁড় করানো যায় তাহলে আমরা অচিরেই তারুণ্যের জয়যাত্রায় একটা জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি নিয়ে খুব সুন্দরভাবে দেশটাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারব। সরকারের দিক থেকে কতগুলো ইতিবাচক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। প্রথমত জাতীয় তথ্যপ্রযুক্তি নীতিমালা ২০০৯ প্রণয়ন করা হয়েছে। এটা খুবই ইতিবাচক বিষয়। কারণ এতে ৩০৬টি অ্যাকশন আইটেম রয়েছে। এটিই সরকারের একমাত্র নীতিমালা, যেখানে অ্যাকশন আইটেম দেয়া আছে। যেমন একটি অ্যাকশন আইটেমে বলা হয়েছে ইন্ডাস্ট্রি ডেভেলপ করার জন্য আইটি ইন্ডাস্ট্রি ডেভেলপমেন্ট অথরিটি করা হবে। হাইটেক পার্ক করার জন্য হাইটেক পার্ক অথরিটি করা হবে। হাইটেক পার্ক অথরিটি ইতোমধ্যেই করা হয়েছে। আইটি ইন্ডাস্ট্রি ডেভেলপমেন্ট অথরিটি এখনো হয়নি। তবে এর জন্য ১০০ মিলিয়ন ডলার অর্থাৎ বর্তমান হিসাবে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা আছে। দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে এটি নীতিমালায় রয়েছে। কিন্তু বাজেটে এর কোনো প্রতিফলন নেই। যে কারণে গত তিন বছর ধরে বাজেটের সময় আমরা বলে আসছি যে আমরা নতুন কোনো কিছু দাবি করছি না। আমরা চাচ্ছি পলিসিতে যা রয়েছে সেটার প্রতিফলন যাতে জাতীয় বাজেটে থাকে। যেমন নীতিমালায় রয়েছে নিয়মিত বাজেটের এক শতাংশ এবং উন্নয়ন বাজেটের দুই শতাংশ আইটির জন্য ব্যবহার হবে। কোনো একটা দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি সমন্বয় করতে হবে। কোনো একটা মন্ত্রণালয় হয়তো ১ শতাংশের বেশি ব্যয় করছে, কিন্তু কেউ সেটা পর্যবেক্ষণ করছে না। আইটি মিনিস্ট্রি কিন্তু পূর্ণ একটি স্বতন্ত্র মন্ত্রণালয়। আগে এটি বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে থাকলেও এটি এখন আলাদা করে পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রণালয় করা হয়েছে। তবে দুঃখজনক হচ্ছে এ মন্ত্রণালয়ে বসার কোনো জায়গা নেই। এখনো কম্পিউটার কাউন্সিলের একটি কক্ষে মন্ত্রী মহোদয় বসেন আর ব্যান্সডকের একটি অফিসে সচিব মহোদয় বসেন। যে নীতিগুলো রয়েছে আর যে পদক্ষেপগুলো নেয়া হয়েছে সেগুলো সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন একটি ডিজিটাল টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। এর প্রথম মিটিংয়ে আমরা পরিত্যক্ত ভবন জনতা টাওয়ারটিকে আইটি পার্ক করার প্রস্তাব করলাম। প্রধানমন্ত্রী ওই মিটিংয়েই তিন মিনিটের মধ্যে এ ব্যাপারে অনুমোদন দিয়ে দিলেন। কিন্তু দুই বছরের মধ্যেও সেটি সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক হয়নি। গত ১০ জুন পার্ক ডেভেলপাররা চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন। কাজেই এটা হবে। হাইটেক পার্ক অথরিটি তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু বাজেটে এর কোনো বরাদ্দ দেখিনি।
আমাদের অস্বাভাািবক অগ্রগতি হতে পারতো। আসলে এই ইন্ডাস্ট্রিটা বা সেক্টরটির উন্নয়নের জন্য মূলত দুটি জিনিস দরকার। সেটি হলো মানবসম্পদ এবং অবকাঠামো। মানবসম্পদের কথা তো আমি আগেই বলেছি মোট জনসংখ্যার ৫০ ভাগের বয়স হচ্ছে ২৫ বছরের নিচে। এ ইন্ডাস্ট্রি ডেভেলপ করার জন্য শুধু কম্পিউটার সায়েন্সের শিক্ষার্থী লাগবে তা নয়। যেকোনো বিভাগ থেকে পড়াশোনা করে এসে আইটির উন্নয়নের জন্য কাজ করতে পারেন। আইটিকে নিজের পেশা হিসেবে বেছে নিতে পারেন। আমাদের তরুণ প্রজন্ম এতই বুদ্ধিমান, সৃজনশীল এবং মেধাবী যে, তারা যেকোনো ধরনের চ্যালেজ্ঞ মোকাবেলা করতে পারেন। তাই এটিকে যদি আমরা কাজে লাগাতে পারতাম বা এখনো যদি পারি তাহলে আমরা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে একেবারে বদলে দিতে পারব। কিন্তু এজন্য প্রয়োজন সমন্বয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন রয়েছে, আইসিটি মন্ত্রণালয় রয়েছে, কম্পিউটার কাউন্সিল রয়েছে, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় রয়েছে সেগুলোর আইটি বাজেট রয়েছে। এসব কিছুর মধ্যে সমন্বয করা হচ্ছে না। এত সব দুর্বলতা সত্ত্বেও আমরা কিন্তু এগিয়ে যাচ্ছি। আমাদের এখানে ৮০০ বা ১০০০-এর মতো কোম্পানি রয়েছে। আমাদের শত সদিচ্ছা থাকলেও এদের সবাইকে আলাদাভাবে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ এবং হাই ব্যান্ডউইডথের ইন্টারনেট দিতে পারব না। কিন্তু ৮০০ কোম্পানি যদি আটটি ভবনে থাকে তাহলে একে কিন্তু বিশেষভাবে চিহ্নিত করে সেখানে বিদ্যুৎ এবং ইন্টারনেট সংযোগ নিশ্চিত করে দেয়া সম্ভব। ভারতের অত্যন্ত পশ্চাৎপদ এলাকা শিলিগুড়িতেও সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক রয়েছে, হাইটেক পার্ক রয়েছে এবং ইনকিউবেটর রয়েছে। এ ধরনের অবকাঠামো আমাদের এখানে নেই। এ অবকাঠামো আমরা দাঁড় করাতে না পারলে আমাদেন আন্তর্জাতিক মার্কেটে বিচরণ করার যে সম্ভাবনা রয়েছে সেটা হারাব। গত বছরের আগের বছর কনসালট্যান্ট কোম্পানি গার্ডনার প্রথমবারের মতো বাংলাদেশকে অন্যতম একটি আউটসোর্সিং দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তরুণ জনগোষ্ঠীর কাজের স্বীকৃতি হিসেবেই তারা এ স্বীকৃতি দিয়েছে। আমাদের তিনটি স্থানে বেশ দুর্বলতা রয়েছে-অবকাঠামো, ইংরেজি ভাষাগত দক্ষতা এবং মেধাস্বত্ব্ব আইন। এগুলো নিশ্চিত করা হলে আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের বড় ধরনের একটি সুযোগ সৃষ্টি হবে। সরকার যখন পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের কথা বলেছে সেটা যদি আইটি সার্ভিসে সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায় তাহলে সেটা পুরো চিত্রটাই বদলে দেবে। শুধু অর্থনীতি নয়, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, কার্যক্রম মনিটর করা যাবে, শিক্ষার লেভেল বাড়বে। আর এসব আবার রফতানি বাড়াতে সহযোগিতা করবে। সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে ইচ্ছুক, তারা আইটির জন্য আলাদা একটি মন্ত্রণালয়ও করেছে। অথচ তাদের বসার কোনো জায়গা নেই।
বর্তমানে সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী সেক্টর গার্মেন্ট সেক্টরের চেয়ে বেশি সম্ভাবনাময় হচ্ছে আইটি সেক্টর। আমি নিশ্চিত যে ১০ বছরের মাথায় এখন যে গার্মেন্টের ২০ বিলিয়ন ডলারের মার্কেট রয়েছে এটাকে আইটি ছাড়িয়ে যেতে পারবে। সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে চাইছে। কিন্তু সরকারের মেশিনারি দিয়ে এটা হবে না। কারণ প্রত্যেকটি মন্ত্রণালয়ে যে আইটি অর্গানোগ্রাম রয়েছে তাতে একজন সিস্টেম অ্যানালিস্ট, এক বা একাধিক প্রোগ্রামার এবং কিছুসংখ্যক অপারেটর থাকেন। পুরো ডিরেক্টরি হিসাব করলে দেখা যাবে এখানে ৬৫১ জন আছেন। এ ৬৫১ জনকে দিয়ে কি ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়া যাবে? এজন্য প্রত্যেকটি মন্ত্রণালয়ে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপে ম্যানেজ সার্ভিস প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এর ফলে দেশে অভিজ্ঞতা অর্জনের পাশাপাশি বিদেশেও সুযোগ বাড়বে। এখন বিভিন্ন ফিল্যান্সিং সাইটগুলোর রেটিংয়েও প্রথম ১০ জনের মধ্যে ২/৪ জন বাংলাদেশী অবস্থান করছেন। এখন ফ্রিল্যান্সিং নিয়ে সারা দেশে এমনকি প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও বড় ধরনের প্রতারণা চলছে। এটাকে রোধ করা না গেলে আমাদের সম্ভাবনাটাই নষ্ট হয়ে যাবে। এ সম্পর্কে সবাইকে জানানোর জন্য আমাদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা কর্মসূচি গ্রহণ করেছি। এ ফ্রিল্যান্সিং এবং আউটসোর্সিংটা আমাদের জন্য একটা সামাজিক বিপ্লব বয়ে আনতে পারে। আর প্রতারণার শিকার হলে এটা আমাদের জন্য ধ্বংস বয়ে আনতে পারে।
আইসিটি খাতের সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে মাইন্ডসেট। যারা বয়সে প্রবীণ তারা মনে করেন তারা পারবেন না। এটা তাদের জন্য নয়, তরুণ প্রজন্মের জন্য। দ্বিতীয়ত হচ্ছে স্বচ্ছতা। একটা অংশ রয়েছে যারা মনে করে আইসিটির কারণে স্বচ্ছতা বেড়ে যাবে, অনেক ধরনের অনিয়ম বন্ধ হযে যাবে, অনেকে মনে করে তাদের কর্তৃত্ব থাকবে না। তৃতীয়ত এর জন্য সরকারের যে স্ট্রাকচার বা অর্গানোগ্রাম থাকা দরকার সেটা নেই। বিষয়গুলো দূর করা গেলে ডিজিটাল বাংলাদেশের প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর হয়ে যাবে। এ ইন্ডাস্ট্রির জন্য বিদ্যুৎ একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এর প্রসারের জন্য বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান করতেই হবে।

সর্বশেষ আপডেট ( বুধবার, 18 জুলাই 2012 06:55 )  

মন্তব্য


নিরাপত্তা কোড
রিফ্রেশ

You are here: Home Section Blog Current Users অর্থনীতির লাইফলাইন হবে তথ্যপ্রযুক্তি